রাসিকের স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে

সেবা ও স্বাস্থ্য বিভাগে ৫২৭ পদ শূন্য

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ করে পরিষেবা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের ফিরিস্তি তুলে ধরা হলেও বাস্তবে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সেবা ও স্বাস্থ্য বিভাগের উন্নয়নে কোনো নজর নেই কর্তৃপক্ষের। ভুক্তভোগীরা এ অভিযোগ করেছেন। যেনতেনভাবে এসব বিভাগ চালু রাখা হয়েছে। বছর দশেক আগেও রাসিকের জন ও স্বাস্থ্যসেবা নগরবাসীর নজর কাড়ে।

কিন্তু ক্রমাগত অবহেলা আর উদাসীনতায় স্বাস্থ্য বিভাগ রুগ্ন হয়ে পড়েছে। জনবল সংকটের পাশাপাশি কিছুদিন ধরে সীমিত হয়ে পড়েছে সিটি কর্পোরেশনের ১৪টি আরবান হেলথ্ কেয়ার সেন্টারের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম।

এখন রাসিকের স্বাস্থ্য বিভাগ শুধু শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি আর শিশু জন্ম আর মৃত্যুর তালিকা নিবন্ধনের মাধ্যমে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে। এছাড়া চলমান করোনাযুদ্ধে রাসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।

রাসিকের বর্তমান মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের আগের আমলে ও চলতি মেয়াদে রাজশাহীতে অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সেবা ও জনস্বাস্থ্য বিভাগ রুগ্ন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে রাসিক স্বাস্থ্য বিভাগে জনবল সংকট তীব্র হওয়া ছাড়াও বিভাগগুলোর প্রতি উদাসীনতাও এ জন্য দায়ী।

রাসিকের স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন পরিষেবা বিভাগে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৯১৭টি। এর মধ্যে ৫২৭টি পদই শূন্য রয়েছে। বর্তমানে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অধীনে কর্মরত আছেন ৩৯০ জন কর্মী। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও সংক্রমণ ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ শাখার ৭০টি পদের মধ্যে ৩৮টি পদ শূন্য রয়েছে। মশক নিয়ন্ত্রণ শাখার ৯৩ পদের মধ্যে ৫৪টি পদ শূন্য রয়েছে।

সেবা বিভাগের পরিচ্ছন্ন শাখার ৪৭টি পদের মধ্যে ৩০টি পদই শূন্য রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত সিটি হাসপাতালের ২৮ পদের মধ্যে ২৮টি পদই শূন্য রয়েছে। অবশ্য চলতি বছরে সিটি হাসপাতালটি ব্যক্তি খাতে ভাড়া দিয়ে এ হাসপাতালের স্বাস্থ্য পরিষেবা সঙ্কুচিত করা হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের সেবা ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিটি বিভাগেই অধিকাংশ পদ খালি থাকায় এসব বিভাগের সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তদবির ও সুপারিশে অধিকাংশ জনবল নিয়োগের ফলে রাসিকের সব বিভাগেই অদক্ষ মানুষে ভরে গেছে। এতে তারা মানুষকে কাক্সিক্ষত সেবা দিতে পারছে না।

বেশ কয়েক বছর আগে নগরীর মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নগরীতে ১৪টি আরবান হেলথ্ কেয়ার সেন্টার নির্মাণ করা হয়। এসব নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে শিশু, মাতৃ ও প্রসূতি সেবা থেকে শুরু করে নানা ধরনের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা কার্যক্রম চালু ছিল।

বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীরা এসব পরিষেবা পরিচালনা করতেন। তবে কয়েক বছর আগে সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল রাজনৈতিক কারণে বরখাস্ত হলে ২১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নিযাম উল আজিম ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পান। এ সময়ে সিটি আরবান হেলথ্ কেয়ার সেন্টারগুলো একটি এনজিওর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তবে এনজিওটি সম্প্রতি সেবা উপযোগী এই হেলথ্ সেন্টারগুলোর কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন নগরীর দরিদ্র মানুষ। আরবান হেল্থ সেন্টারগুলোর বেশ কয়েকটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত হয়েছে। এদিকে বর্তমান মেয়রের আমলে সিটি কর্পোরেশনের মালিকানাধীন নগরীর তালাইমারীতে অবস্থিত সিটি হাসপাতালটিও ব্যক্তি মালিকানায় ইজারা দেয়া হয়েছে। সিটি হাসপাতালটি ভাড়া দেয়ার সময় নগরবাসী আপত্তি তুললেও নানা কারণে বর্তমান সিটি কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে চলমান করোনাকালে নগরীর নিম্ন আয়ের নারী শিশু ও প্রসূতি মায়েরা চিকিৎসা বঞ্চিত হলেও সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা করোনার ভয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

রাসিক স্বাস্থ্য বিভাগের স্থবির কার্যক্রমকে সচল করতে গত ২৯ জুন রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ওয়ার্ড সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি সভা করেছেন। এ সভায় করোনা আক্রান্তদের সহায়তা ও সন্দেহভাজনদের নমুনা পরীক্ষাসহ স্বাস্থ্য পরিষেবা বঞ্চিতদের সহায়তার জন্য ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ‘কুইক রেসপন্স টিম’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে এ টিম নগরীতে কাজ করবে।

রাসিকের স্বাস্থ্য ও সেবা বিভাগের স্থায়ী কমিটির সভাপতি ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নুরুজ্জামান টুকু বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিষেবা বিভাগে কর্মী সংকট রয়েছে। আর্থিক সংকটে অনেকের বেতন ভাতা হচ্ছে না। ফলে কর্পোরেশনের স্বাস্থ্যকর্মীরা মনোবল হারাচ্ছেন। করোনাকালে আরও কিছু বাস্তব সমস্যার কারণে নগরীর দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বন্ধ স্বাস্থ্যসেবাগুলোও চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।