করোনার দুই মাসে টিকা বঞ্চিত আড়াই লাখ শিশু

সোনালী ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় কর্মরত কাকলী সাহা। স্বামী ও পাঁচ মাসের পুত্র-সন্তানকে নিয়ে থাকেন টিকাটুলি এলাকায়। ছেলের এখনো বেশ কয়েকটি টিকা বাকি। করোনা পরিস্থিতি শুরুর পর এখনো টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে কার্যক্রম চালু হয়নি। এর মধ্যে আবারো বিভিন্ন এলাকায় ‘লকডাউন’ করার কথা অন্যদের মতো কাকলীও জানতে পেরেছেন। সন্তানকে সময়মতো টিকা দিতে না পেরে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
কাকলীর মতো অনেক অভিভাবক সন্তানকে সময়মতো টিকা দিতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বিশেষ করে নবজাতকের বাবা-মায়েদের উদ্বেগ যেন একটু বেশি। কারণ অনেকেরই টিকা দেয়া এখনো শুরুই করা যায়নি।

শিশুদের টিকা দেয়া বন্ধ থাকায় বিভিন্ন রকমের সংক্রমণের আশঙ্কা করছেন অনেকেই। বিশেষ করে হাম-রুবেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ টিকাদান বন্ধ থাকায় এই আশঙ্কার মাত্রা যেন বেড়েছে। কেননা, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে দেশে দুই পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

আর শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু ও নবজাতককে সঠিক সময়ে তাদের টিকাগুলো দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, ওই সব টিকা একদিকে যেমন মৃত্যুঝুঁকি কমায়, অন্যদিকে তাদের জটিল রোগ থেকেও রক্ষা করে।

এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, করোনা ভাইরাসজনিত লকডাউনের কারণে বিশ্বব্যাপী এ বছর প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। ফলে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বে হামে মৃত্যুর পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশসহ ২৪টি দেশ তাদের টিকা কার্যক্রম দেরিতে পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

ইপিআইর আওতায় সারাদেশে মা ও শিশুকে ১০টি সংক্রামক রোগের নিয়মিত টিকা দেয়া হয়। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন গড়ে ৬-৭ হাজার কেন্দ্রে এ কর্মসূচি পরিচালিত হয়। সিটি করপোরেশন, বিভিন্ন হাসপাতাল এবং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের স্থায়ী কেন্দ্রে টিকা দেয়া হয়। সিটি করপোরেশনের বাইরে সারাদেশে ১ লাখ ২০ হাজার টিকাদান কেন্দ্র রয়েছে। কেন্দ্রগুলো অস্থায়ী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যক্তিবিশেষের বাসা-বাড়িতে অবস্থিত। ওই সব বাড়ির লোকজনের বহিরাগতদের সমাগমে বিব্রতবোধ করা এবং করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় কেন্দ্রগুলো বন্ধ রয়েছে।

সরকারের ম্যাটারনাল এন্ড নিওন্যাটাল হেলথ কেয়ারের (এমএনসিএএইচ) পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ মজুত থাকার পরও করোনা সংক্রমণের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। করোনার কারণে এপ্রিল ও মে এই ২ মাসে আড়াই লাখ শিশু টিকা বঞ্চিত হয়েছে। জুনের শুরু থেকে এই কর্মসূচি গ্রামাঞ্চলে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলেও শহর এলাকায় এই কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। এর কারণ হিসাবে এমএনসিএএইচ লাইন ডিরেক্টর ডা. শামছুল হক ভোরের কাগজকে জানান, দেশে গ্রাম ও শহরে দুইভাবে এই সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। গ্রামে স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। আর শহরে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয় বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার (এনজিও) মাধ্যমে।

তিনি বলেন, করোনার সময় যখন লকডাউন শুরু হলো তখন গ্রামাঞ্চলের আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি যেতে পারেনি। অনেক পরিবার থেকেও ওই সময়ে বাধা দেয়া হয়েছে। এই সময়ে কীভাবে কার্যক্রম সচল রাখতে হবে সেবিষয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জুন মাস থেকে গ্রামাঞ্চলে আমরা এই কর্মসূচি শুরু করতে পেরেছি। বাদপড়া শিশুদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের টিকা দেয়া হচ্ছে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে শহর এলাকায়। কেননা, শহরে এই কর্মসূচি এনজিওর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে স্থানীয় সরকার। এখনো এনজিওগুলো তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করেনি এবং অফিস খুলেনি। ফলে শহরের শিশুরা এখনো টিকা থেকে বঞ্চিত। এ বিষয়ে দুই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেই আমাদের বৈঠক হয়েছে। তারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন দ্রুতই এই সমস্যার সমাধানে তারা উদ্যোগ নেবেন।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের এখন সব মনোযোগ করোনা এবং জোনভিত্তিক লকডাউন এই বিষয়ে। তবে শিশুদের টিকা দেয়ার বিষয়টি নিয়েও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। সময়ের টিকা সময়মতো দেয়া না হলে শিশুদের অবশ্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। তবে আপাতত সামান্য কিছু ক্ষতি হলেও তা যাতে ব্যাপকভাবে না হয় সেদিকেই আমাদের লক্ষ্য এবং সেভাবেই আমরা কাজ করছি।