ত্রিমুখী চাপে ব্যাংক খাত!

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্ব অর্থনীতি তছনছ। সারা বিশ্বেই কমেছে ভোক্তা চাহিদা। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আগামী অর্থবছরের জন্য পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট প্রস্তাব করেছে সরকার। বাজেটের বিশাল অঙ্কের ঘাটতি পূরণে ৮৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণের ওপর ভরসা রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। এর আগেই মানুষের জীবন ও জীবিকা বাঁচাতে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি প্রণোদনার দায়িত্বও দিয়ে রাখা আছে ব্যাংক খাতকে। ঋণপ্রবাহ সচল না থাকলে ধাক্কা খাবে বেসরকারি খাত। সব মিলিয়ে বিশাল বোঝার চাপ সৃষ্টি হয়েছে ব্যাংক খাতের ওপর। ভার বহন করার সক্ষমতা ব্যাংকগুলোর আদৌ আছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা।
করোনা ভাইরাসে সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারিতে দেশের আমদানি-রপ্তানি কমে গেছে। রাজস্ব আয়ের পরিস্থিতি নাজুক। নানা কৌশলে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসী আয়ে সুখবর এলেও সামনের দিনগুলোতে প্রবাসীদের অবস্থা কী হবে তা বলা কঠিন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি এখনো ভালো। আগের চেয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে অনেক বেশি। ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা এক দফা বাড়ানো হয়েছিল। করোনা পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্যও ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া আমদানি-রপ্তানি হ্রাস ও সুদহার কমায় ব্যাংকগুলোর আয়ও কমে যাচ্ছে। বাজেট বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে যে ব্যাংক নির্ভরতার কথা বলা হয়েছে তা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান। ভোরের কাগজকে তিনি বলেন, বিশাল ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণ নেয়া হবে ৮৫ হাজার কোটি টাকা। প্রণোদনার অর্থ দেবে ব্যাংক খাত। নতুন বছরের বাজেটে এই বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা দ্বিগুণ ধরা হয়েছে। এই অর্থনীতি বিশ্লেষক বলেন, খেলাপি ঋণসহ নানা কারণে ব্যাংক খাত নিজেই ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে রয়েছে। করোনায় ব্যাংকের সংকটও বাড়ছে। এতে ব্যাংকের তারল্য সংকট আরো প্রকট হয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে সব খাতে অর্থ সরবারহ বাধাগ্রস্ত হবে। অর্থায়নের জন্য ব্যাংকের বাইরে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভরশীল হলে ভালো হতো বলে জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাব অনুসারে, আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি ধরা হচ্ছে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশ। বিশাল এ ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে ৮৪ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। চলতি (২০১৯-২০) বাজেটে যা ছিল ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা, সংশোধন করে এটি ধরা হয়েছে ৮২ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে করোনার কারণে রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ঋণ নিচ্ছে সরকার। নতুন অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে তিন লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর শেষে রাজস্ব আদায় হতে পারে দুই লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। করোনা সংকটের মধ্যেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। যা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
করোনা সংক্রমণরোধে ঘোষিত সাধারণ ছুটির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, কারখানা, উৎপাদন সব বন্ধ ছিল। তাদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার ১৯টি প্যাকেজের আওতায় এক লাখ তিন হাজার ১১৭ কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এই টাকার সিংহভাগ ঋণ হিসেবে দেবে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এদিকে, সরকার চাহিদামাফিক ঋণ না নিতে পারলে তার খরচ জোগাতে পারবে না। বেসরকারি খাতে ঋণ না পেলে বিনিয়োগ বাড়বে না। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান হবে না। ফলে করোনার কারণে যেসব মানুষ কাজ হারিয়েছেন তারা কাজের সুযোগ পাবেন না। আবার প্রণোদনার অর্থ দেয়া না হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না। ব্যাংক যদি এসব অর্থ দিতে না পারে তা হলে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি হবে না। অর্থাৎ ত্রিমুখী চাপের মধ্যে পড়েছে ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান এ প্রসঙ্গে জানান, বাজেট অর্থায়নের জন্য সরকার খুব বেশি পরিমাণে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিলে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। এছাড়াও ইতোমধ্যে ঘোষিত প্রণোদনাগুলোও বহুলাংশে ব্যাংকনির্ভর। কাজেই ব্যাংকগুলোর ওপর বাজেট অর্থায়নের চাপ খুব বেশি না দেয়াই কাম্য। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট অনুসারে সরকার ৮২ হাজার কোটি টাকার বেশি অভ্যন্তরীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। আর প্রস্তাবিত বাজেটে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেয়া ঋণের অনুপাত বেড়েছে ৪ শতাংশের কম। মোট জাতীয় বাজেটের আকার বেড়েছে ১৩ শতাংশের বেশি। সে হিসাবে বলা যায়, সরকার সচেতনভাবেই অভ্যন্তরীণ ব্যাংকগুলোর ওপর কম চাপ দেয়ার পরিকল্পনা করেছে।
যদিও ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাজেটে ঘাটতি পূরণে সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ চলতি অর্থবছরে ইতোমধ্যে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ৭৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। কোনো সমস্যা হয়নি। চলতি অর্থবছর ৮২ হাজার কোটি টাকা নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে। এতেও সমস্যা হবে না। গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংক খাতে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি নগদ তারল্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। এছাড়া রিজার্ভ রয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। ফলে ব্যাংক খাতের তারল্য সমস্যা নেই। ঋণ নিলে এ খাতের কোনো সমস্যা হবে না। সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা বাস্তবায়নেও কোনো সমস্যা হবে না জানান গভর্নর।
এদিকে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার কারণে ব্যাংকগুলোর আমানত বাড়ছে না। খুব শিগগিরই বাড়বেও না। বরং আমানত তুলে নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ১ এপ্রিল থেকে ঋণে ৯ শতাংশ সুদহার কার্যকর করায় আয় আগের তুলনায় কমে গেছে। আবার করোনার কারণে ঋণের টাকা আদায় হচ্ছে না। সব মিলিয়ে টাকার সংকটে পড়ছে ব্যাংকগুলো।