মমতা ব্যানার্জি

মমতা : হার না মানা এক দুঃসাহসীর গল্প

হাঁটতে পছন্দ তার। গল্প করতে করতে টানা ১০ কিলোমিটার হেঁটে ফেলেন। হাঁটি হাঁটি পা পা করেই এতদূর। পাঁচ জানুয়ারি উনিশশ’ পঞ্চান্ন।

কলকাতার একটি নিু মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। বাবা প্রমিলেশ্বর ব্যানার্জি ছিলেন স্কুলশিক্ষক। মেয়েটির বয়স তখন মাত্র ৯ বছর।

তখনই তার বাবা চলে গেলেন চিকিৎসার অভাবে। মা গায়েত্রী দেবী। কষ্টেসৃষ্টে মানুষ করেন মেয়েকে। সেই মেয়ে আজকের মমতা ব্যানার্জি।

ইতিহাস বিষয়ে তিনি স্নাতক পাশ করেন যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে। ইসলামের ইতিহাস নিয়ে তিনি স্নাতকোত্তর পাশ করেন কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে।

এখানেই থেমে থাকেননি জ্ঞানপিপাসু এই নারী। এরপর শ্রী শিক্ষায়তন থেকে এডুকেশনের উপর নেন বিশেষ ডিগ্রি। এমনকি তিনি যোগেশচন্দ্র চৌধুরী আইন কলেজ থেকে আইন বিষয়েও ডিগ্রি অর্জন করেন।

বহু সংগ্রাম আর ত্যাগের পর তিনি আজকের মমতা। তৃণমূল কংগ্রেসকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজের ভালোবাসা আর শ্রম দিয়ে। তিনি যেমন ভালোবেসেছেন, তেমনি অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছেনও। সাধারণের কাছ থেকে। বাংলার মানুষ ভালোবেসে তাকে ‘দিদি’ বলে ডাকেন।

২০১২ সালে টাইম ম্যাগাজিন প্রকাশিত বিশ্বের সেরা ১০০ প্রভাবশালী মানুষের তালিকায় মমতা ব্যানার্জি জায়গা করে নেন। এই একই তালিকায় বারার ওবামা, হিলারি ক্লিনটন, ওয়ারেন বাফেট, টিম কুকদের মতো মানুষের নামও রয়েছে।

একই বছর ব্লুমবার্গ এর বিশ্বের সেরা ৫০ প্রভাবশালী মানুষের তালিকায়ও তিনি জায়গা করে নেন। এই মহীয়সী, ত্যাগী ও হার না-মানা নারীর জীবনীর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র ‘বাঘিনী’। এটি পরিচালনা করেন নেহাল দত্ত।

রাজনীতিতে তার অভিষেক ছাত্র জীবনেই। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে সাফল্য তাকে কখনই ছেড়ে যায়নি। ১৯৭০-এ তিনি কংগ্রেসের মহিলা জেনারেল সেক্রেটারি হন। ১৯৭৮-৮১ জেলা কংগ্রেসের সেক্রেটারি।

১৯৮৪ সালে লোকসভার সদস্য নিযুক্ত হন। পাশাপাশি সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সেক্রেটারির পদেও নিযুক্ত হন। ১৯৯১-৯৩ সালে তিনি কেন্দ্রে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর চেয়ারপার্সন নিযুক্ত হন।

১৯৯৮ সালে চতুর্থ বারের জন্য লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৩ অক্টোবর ১৯৯৯-২০০১ তিনি রেল দপ্তরের ক্যাবিনেট মন্ত্রী হন। ২০০৪ সালে কয়লা মন্ত্রী, ২০০৬ সালে গৃহ মন্ত্রণালয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। মমতা ব্যানার্জি মোট ৭ বার লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

এ ছাড়াও ৩৪ বছরের বামশাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে বাংলার সর্বপ্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

তিনিই প্রথম মহিলা হিসাবে কয়লামন্ত্রীর পদ সামলেছেন এ ছাড়াও মানবসম্পদ উন্নয়ন রাষ্ট্রমন্ত্রী, যুবকল্যাণ দপ্তর, নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও সাফল্যের সঙ্গে সামলেছেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনেও তিনি জয়ী হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন।

বিরোধী নেত্রী থাকার সময় তাকে বহু অত্যাচার আর নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। ১৯৯০ সালে তাকে বিরোধীরা আক্রমণ করে এবং মাথার খুলিতে আঘাত পান তিনি। সেসময় এক মাস হাসপাতালে ছিলেন। ১৯৯৩ সালে আবার তাকে মার খেতে হয় মহাকরণ অভিযানের সময়। এই অভিযানে পুলিশ গুলি চালায়। এবারের নির্বাচনি প্রচারণার সময়ও তাকে আক্রমণ করা হয়েছিল। পায়ে ভীষণভাবে আঘাত পান তিনি। হুইল চেয়ারে চড়ে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে গেছে তাকে। মানসিক আঘাতেরও শিকার হয়েছেন তিনি। ‘কালীঘাটের ময়না’, ‘ঠাকুমা’ ইত্যাদি ইত্যাদি বলে তাকে ছোট করার চেষ্টা করা হতো।

মুখে মুখে ছড়া তৈরি করতে পারেন এই জননেত্রী। বিভিন্ন জনসভায় কোনো রকম স্ক্রিপ্ট ছাড়াই তাই বিরোধীদের নিশানা করে দুই-চার লাইনের ছড়া কাটতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই ছড়া শুনে প্রশংসা আর হাততালিতে ভরিয়ে দেয় উপস্থিত জনতা।

মমতা বহু কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধ, এমনকি উপন্যাসও লিখেছেন। তিনি একজন চিত্রশিল্পীও বটে। তার আঁকা ছবি বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকার পুরোটাই তিনি দেন পার্টির তহবিলে। পূর্ণ সময়ের রাজনীতিতে আসার আগে মমতা ব্যানার্জি একজন স্টেনোগ্রাফার হিসাবে কাজ করতেন। এ ছাড়াও তিনি কখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা, কখনও প্রাইভেট টিউটর এমনকি সেলস গার্লের কাজও করেছেন।

মমতা ব্যানার্জি গান শুনতে ভালোবাসেন। গানের বেলায় রবীন্দ্রনাথ আর কবিতায় নজরুল তার প্রিয়।

বীরভূমে মমতার মামার বাড়ি। ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে মামার বাড়ি গেলেই সেখানকার ধানখেতে খেলা করতেন আজকের পশ্চিমবঙ্গের এই মুখ্যমন্ত্রী।

অভিজাত ব্যক্তিত্বের এই নারী সাধারণের মতোই দক্ষিণ কলকাতার ঘিঞ্জি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে টালির বাড়িতে থাকেন। অল্প বৃষ্টিতেই তার বাড়ির সামনে পানি জমে যায়। তখন বাড়ির সামনে পাতা ইটের উপর পা রেখে হাঁটতে দেখা গেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে।