পদ্মায় স্পিডবোটে যাত্রী পারাপর

পদ্মায় চলাচলকারী ৪০০ স্পিডবোটের মধ্যে রুট পারমিট ২৮টির

পদ্মা পারাপারকে ঘিরে গড়ে ওঠা ভয়াবহ নৌ সিন্ডিকেটের কাছে সব নিয়ম কানুনই যেন তুচ্ছ। লকডাউনের মধ্যে স্পিডবোট চলাচল বন্ধ থাকার কথা ছিল। তবে বোটে নিয়ম অনুযায়ী ১২ জনের বেশি যাত্রী ওঠারই কথা নয়। থাকার কথা ছিল পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট। কিন্তু কোনো কিছুই মানা হয়নি। নৌপুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ কিংবা নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কোনো বাধা ছাড়াই চলছিল সব।

সোমবার (৩ মে) সকালে মাদারিপুরের বাংলাবাজার ঘাটে স্পিডবোড দুর্ঘটনার পর এখন নড়েচড়ে বসেছেন সবাই। এ ঘটনায় স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিটিএ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

জানা গেছে, শিমুলিয়া ঘাট থেকে প্রতিদিন ৪’শর বেশি স্পিডবোট চলাচল করলেও এদের মধ্যে রুট পারমিট রয়েছে মাত্র ২৮টির। একই অবস্থা ছোট লঞ্চগুলোর ক্ষেত্রেও। তাই বাধ্য হয়ে কখনো ছোট লঞ্চের অতিরিক্ত যাত্রী হিসেবে, আবার কখনও বেপরোয়া স্পিডবোট চালকের হাতে জীবন সপে দিয়ে পদ্মা পাড়ি দিতে হয় যাত্রীদের। এসব অনিয়মের কারণে গত এক যুগে অন্তত তিনশ যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন শুধু পদ্মায়।

দুর্ঘটনার পর শিবচরের পুলিশ পরিদর্শক আমির হোসেন জানান, বোটটিতে ৩৫ জনের মতো যাত্রী ছিল। এর মধ্যে ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি হাজি মো. শহীদ মিয়া বলেন, এখানেই অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে। কারণ ওই রুটের স্পিডবোটগুলোর ধারণ ক্ষমতা হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ১২ জন। দেখা গেছে সেখানকার বোটগুলোর রুট পারমিটই নেই। এমনকি দক্ষ চালকও নেই। দিন-রাত এরা চলাচল করে। স্পিডবোট চালকরা এতোটাই বেপরোয়া যে, যাত্রীর সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে পানিতে ফেলে দেওয়া কিংবা পদ্মার চরে নববধু হত্যার মতো ঘটনাও এরা ঘটিয়েছে।

সোমবার সকালে বাল্কহেড ও স্পিডবোট সংঘর্ষে বোটটি ভেঙে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আর এ ঘটনায় ২৬ জন নিহত হন। 

তিনি বলেন, শুধু ২০১৯-২০২০ সালেই পদ্মায় ৩০টির বেশি দুর্ঘটনার খবর আমাদের কাছে রয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় অনেকে হতাহত হয়েছেন। এখনও ছোট ছোট লঞ্চ চলাচল করে। লঞ্চগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া হয়। ফলে পিনাক ডুবির মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনাও আমাদের দেখতে হয়েছে।

সঠিক পরিসংখ্যান দিতে না পারলেও তিনি জানান, পদ্মায় গত এক যুগে এক হাজারের বেশি দুর্ঘটনায় অন্তত তিনশ যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন।

বিআইডব্লিটিএর চেয়ারম্যান কমডোর এম গোলাম সাদেক বলেন, দুর্ঘটনার পরপরই আমাদের নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের পরিচালক ঘটনাস্থলে গিয়েছেন। এ নিয়ে সংস্থাটির যুগ্মপরিচালক ইকবাল আলমকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

তিনি জানান, ওই রুটে স্পিডবোট চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে দীর্ঘদিন ধরেই তারা চেষ্টা করছেন। কিন্তু মালিকরা খুব একটা সহযোগিতা করছেন না। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরও এ নিয়ে কাজ করছে।

এ পর্যন্ত মাত্র ২৮টি স্পিডবোড রুট পারমিট নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি, ওই রুটে প্রায় ৪০০ বোট চলাচল করে। আমরা শিগগিরই এ বিষয়ে এ্যাকশনে যাব। তবে যেহেতু ওই রুটে অনেক যাত্রী চলাচল করে, সেহেতু আমাদের এটাও খেয়াল রাখতে হচ্ছে যে হঠাৎ বন্ধ করে দিলে যেন মানুষের অসুবিধা না হয়।

শিমুলিয়া দিয়ে প্রায় পদ্মাপাড়ি দেয়া শরীয়তপুরের বাসিন্দা আখতারুজ্জামান জুয়েল জানান, এ রুটটি পাড়ি দিয়ে গিয়ে তারা সব সময় এক ধরণের আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। স্পিডবোটগুলোতে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট থাকে না। আসনের চেয়ে বেশি যাত্রী ওঠানো হয়। ভাড়াও নেওয়া হয় ইচ্ছে মতো। কিন্তু এ নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। এখানকার চালকরা খুবই বেপরোয়া। সবাই একজোট। কোনো যাত্রী একটু প্রতিবাদ করলে তাকে বোট থেকে নামিয়ে দেওয়া, অপমান করা- এসব তাদের কাছে নিত্যদিনের কাজ। তারা এতোটাই গতিতে চালায় যে মাঝে মাঝে মনে হয় এই বুঝি উল্টে যাবে বোটটি।

বিআইডব্লিউটিএর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, কয়েক বছর আগে এখানকার স্পিডবোটগুলো নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয় নৌপরিবহন অধিদপ্তর। একজন পরিদর্শক স্পিডবোট নিবন্ধন করার জন্য ঘাট এলাকায় আসলেও ইজারাদার, মালিক ও চালকরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে সহযোগিতা করেনি। ফলে তিনি চলে যান। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের অনুমোদন পাওয়ার পর রুট পারমিট বা চলাচলের অনুমতি দিতে পারে বিআইডব্লিউটিএ। কিন্তু তারা তো অনুমোদনের তোয়াক্কাই করে না। নৌপুলিশও তাদের আটকে সহায়তা করে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।